আন্তর্জাতিক

ঠিকানা দেখে ভবিষ্যৎ নয়’- ছাত্রদের ক্ষোভে উত্তাল প্যারিস

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অবহেলিত ও দরিদ্র শহরতলি থেকে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী বিক্ষোভ এখন সমগ্র দেশে এক বিশাল গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, শ্রেণিকক্ষে গাদাগাদি অবস্থা এবং তীব্র শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশটির এক হাজারের বেশি উচ্চবিদ্যালয়। আন্দোলন দমাতে ফরাসি পুলিশের টিয়ার গ্যাসের সেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ এবং ঢালাও গ্রেপ্তারের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরো বিষিয়ে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় এই শিক্ষা আন্দোলনের পেছনে সরকারের বাজেট সংকোচন নীতি ও প্রান্তিক অঞ্চলের প্রতি ঐতিহাসিক বৈষম্যকেই মূল অনুঘটক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

আন্দোলনের মূল সূত্রপাত প্যারিসের অদূরে সাঁ-দ্যনি এবং ওবেরভিলিয়ার্সের মতো দরিদ্র এলাকাগুলো থেকে। বিশেষ করে স্যান-স্যাইন্ট-দ্যনিস (Seine-Saint-Denis) বিভাগের দুই-তৃতীয়াংশ উচ্চবিদ্যালয়ে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে মার্সেই, স্ট্রাজবার্গ, তুর ও লিলের মতো অন্যান্য শহরেও বিস্তৃত হয়।

প্রতিবাদের জবাবে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে সংঘাতময় করে তুলেছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, অন্তত ১,২০০টি বিদ্যালয়ে বিক্ষোভের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫,০০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেটের আঘাতে অনেক শিক্ষার্থীর চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দাঁত ভেঙেছে এবং মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ দেশের এই বিশৃঙ্খলাকে “এক ধরনের অগ্রহণযোগ্য সহিংসতার পরিবেশ” বলে আখ্যা দিয়ে কঠোরভাবে শৃঙ্খলা ফেরানোর তাগিদ দিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের দাবি খুবই মৌলিক—একটি সমতাপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বার্তা ছিল: “আমাদের আবাসিক ঠিকানা যেন আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে।”

ফ্রান্স সরকারের সদ্য ঘোষিত ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক খাতে ব্যাপক কাটছাঁটের পরিকল্পনা উঠে এসেছে, যা এই বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেট অনুযায়ী ফ্রান্সের শিক্ষা খাতে ৬৫.৫৩ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে-যা পূর্বের তুলনায় ১.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও তা মূল মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে বেশ কম। ফলে অর্থের এই সামান্য বৃদ্ধি মূলত খাতটির ঘাটতি মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালেই বিলুপ্ত করা হচ্ছে প্রায় ৩,২৫৬টি শিক্ষকের পদ, যা কর্মক্ষেত্রের সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। আঞ্চলিক বিষমতার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে স্যান-স্যাইন্ট-দ্যনিসে, যেখানে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্কুলেই প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। এছাড়া শিক্ষা খাতে দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা নির্দেশ করছে শিক্ষার্থীপ্রতি গড় ব্যয়ের হিসাব; ২০১০ সালে যা ছিল ১১,৯১০ ইউরো, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১১,৬৬০ ইউরোতে। অর্থাৎ গত দেড় দশকে প্রতিটি শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের ব্যয় প্রায় অপরিবর্তিত বা স্থবির অবস্থায় রয়েছে, যা দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৭ সালের শিক্ষা বাজেট ১.৭% বাড়িয়ে ৬৫.৫৩ বিলিয়ন ইউরো করার প্রস্তাব করেছে, যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে অনেক কম। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে একে সমর্থন করে দাবি করেন, শিশু ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার কারণেই এই বাজেট সমন্বয় করা হয়েছে। তবে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর দাবি, ২০২৬ সালেই ৩,২৫৬টি শিক্ষকের পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে, যা সংকটকে ঘনীভূত করেছে।

বঞ্চিত এলাকার অভিভাবক ও শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন যে, রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রস্থলের স্কুলের তুলনায় শহরতলির স্কুলগুলো চরম উপেক্ষিত। অনেক স্কুলে এমনকি সুপেয় পানির ব্যবস্থাও নেই। শ্রেণিকক্ষে কোনো নার্স বা সামাজিক কর্মী না থাকায় সুবিধাবঞ্চিত ও শিক্ষার চ্যালেঞ্জে থাকা শিক্ষার্থীরা মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

শিক্ষক সংকটের কারণে গণিত, মানবিক, ইংরেজি ও খেলাধুলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্লাস মাসের পর মাস বন্ধ থাকছে। অনেক শিক্ষার্থী ফরাসি ভাষার মতো আবশ্যিক বিষয়ের শিক্ষক ছাড়াই চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখোমুখি হতে বাধ্য হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, এই আন্দোলন নিছক কোনো সাময়িক অসন্তোষ নয়; বরং এটি ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

শিক্ষাবিদ ও গবেষক ক্লেমেন্স কার্দো-কাঁর মতানুসারে, এর আগে ১৯৯০-এর দশকে ফ্রান্সে বাকালোরেয়া (Baccalauréat) পরীক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের পর অনুরূপ আন্দোলন হয়েছিল। সে সময় সম্পদ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা আবার স্থবির হয়ে পড়ে।

২০১৮ সালে চালু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়া পারকোরসাপ শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত অস্বচ্ছ ও বৈষম্যমূলক হিসেবে সমালোচিত। এটি শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্যারিস ৮ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী উলিস রাবাতে মনে করেন, ফ্রান্সের উপান্তিক বা প্রান্তিক শহরতলিগুলো এখন জাতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করার মতো ক্ষমতা তৈরি করছে। তিনি উল্লেখ করেন-যখন কোনো দেশে জনসেবা ও সরকারি শিক্ষা ভেঙে পড়ে, তখন তার সবচেয়ে নির্মম শিকার হয় সমাজের সর্বনিম্নে থাকা মানুষেরা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে তাতক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের শান্ত করা ফরাসি সরকারের জন্য এখন একটি বিশাল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।