মহাকালের পথে নানা পাটেকার
ভোরের নির্জনতা চিরে হঠাৎ ভেসে এলো এক স্তব্ধ করে দেওয়া দুঃসংবাদ। আরব সাগরের নোনা হাওয়া আর গোয়ার ডোনা পাওলার বাসভবন তখন এক গভীর শোকে আচ্ছন্ন। থমকে গেছে ঘড়ির কাঁটা, চিরতরে নিভে গেছে ভারতীয় রুপালি পর্দার এক প্রদীপ্ত শিখা। ডোনা পাওলার নিজের বাসভবনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন কিংবদন্তি অভিনেতা বিশ্বনাথ পাটেকার, যাঁকে বিশ্ব চেনে নানা পাটেকার নামে। হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসকরা টানা ৪৫ মিনিট সিপিআর দিয়েও বাঁচাতে পারেননি তাঁকে; ভোর ৫টা ২০ মিনিটে পরলোকের অমোঘ আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বিদায় নেন এই মহাতারকা। ৭৫ বছরের এক দীর্ঘ, প্রথাভাঙা ও সংগ্রামমুখর রূপকথা থমকে গেল চরম এক নিঃশব্দতায়।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জঞ্জিরায় এক সাধারণ মারাঠি পরিবারে জন্ম নেওয়া বিশ্বনাথ পাটেকার জীবনকে চিনেছিলেন খুব কাছ থেকে। মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন আর অভাবের চরম কষাঘাতে একসময় পেটের দায়ে যিনি রাস্তার দেওয়ালে সিনেমার পোস্টার এঁকেছেন, তিনিই একদিন নিজের শক্তিশালী অভিনয় দিয়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে নিজের ছবি এঁকে নেবেন, তা যেন বিধাতারই এক নাটকীয় চিত্রনাট্য। মুম্বাইয়ের স্যার জে. জে. ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড আর্টের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থী ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রথম ফ্রেমে সেই কৃশাঙ্গ, চোয়ালবদ্ধ তরুণকে দেখে কেউ হয়তো ভাবেনি, এই মানুষটিই একদিন অভিনয়শৈলীর প্রচলিত সব সংজ্ঞা চুরমার করে দেবে।
নানা পাটেকর শুধুই অভিনয় করতেন না; পর্দায় প্রতিটি চরিত্রের সাথে নিজেকে ছাই করে আবার নতুন করে জন্ম নিতেন। মীরা নায়ারের অস্কার মনোনীত সালাম বোম্বের শুটিং চলাকালে ছুরিকাহত হওয়া কিংবা পারিন্দা ছবির বাস্তব আগুনের দৃশ্যে শরীর পুড়িয়ে ফেলা, অভিনয়ের প্রতি এমন চরম আত্মাহুতি বিশ্বসিনেমায় বিরল। পারিন্দার সেই ক্রুদ্ধ গ্যাংস্টার আন্না শেঠ কিংবা ক্রান্তিবীর-এর সেই কালজয়ী শেষ সংলাপ; যখনই তিনি কথা বলতেন, মনে হতো সমাজব্যবস্থার মুখে তীব্র এক চপেটাঘাত মারছেন।
প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক (১৯৯১) চলচ্চিত্রটির প্রস্তুতি নিতে তিনি ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মিতে যোগ দিয়ে তিন বছর কঠোর প্রশিক্ষণ নেন। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময়ও মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অঙ্গার, তিরঙ্গা, অগ্নি সাক্ষী, খামোশি, আব তক ছাপ্পান থেকে শুরু করে ওয়েলকাম-এর উদয় শেঠি কিংবা মারাঠি মাস্টারপিস নটসম্রাট-তাঁর বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা এবং শ্রেষ্ঠ খলনায়ক-তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতেই ফিল্মফেয়ার ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ের বিরল ইতিহাস রয়েছে তাঁর। শিল্পকলায় অনন্য অবদানের জন্য ২০১৩ সালে তিনি পান রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মশ্রী।
পর্দায় যার রূপ ছিল রুক্ষ, প্রতিবাদী আর আপসহীন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন মাটির কাছাকাছি এক সহজ-সরল মানুষ। খ্যাতির চরম শিখরে পৌঁছেও বিলাসিতাকে দূরে ঠেলে বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ জীবন। ব্যক্তিগত জীবনে নানা আঘাত পেয়েছেন, মাত্র দুই বছর বয়সে নিজের প্রথম সন্তান দুর্বাসাকে হারানো, ২৮ বছর বয়সে বাবার প্রয়াণ, সব শোককে তিনি শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন। মহারাষ্ট্রের খরা পীড়িত কৃষকদের কান্নায় যাঁর হৃদয় কেঁদে উঠত, নীরবে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ভালোবাসার হাত। তিনি শুধুই রূপালি পর্দার মহাতারকা ছিলেন না, ছিলেন এক প্রকৃত নায়ক।
মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসকদের টানা ৪৫ মিনিটের প্রাণপণ লড়াই শেষ পর্যন্ত হার মানল নিয়তির অলিখিত বিধানের কাছে। চিকিৎসাকক্ষ থেকে যখন জানানো হলো তিনি আর নেই, তখন পুরো বিনোদন জগতে নেমে এলো অসীম শূন্যতা। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে মেডিকো-লিগ্যাল কেস (MLC) দায়ের করে ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জীবনের শেষ পর্বেও ও রোমিও ও সুবেদার-এর ফ্রেমে তাঁর যে দীপ্তি দেখা গিয়েছিল, তা চিরকালের জন্য থমকে গেল গোয়ার এই একলা সকালে।
নানা পাটেকর আজ শারীরিকভাবে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির এক বিশাল সমুদ্র। তিনি থেকে গেছেন প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তোলা তাঁর বজ্রকণ্ঠে, সাধারণ মানুষের ভালোবাসায়। রুপালি পর্দার সেই নিঃসঙ্গ সিংহ হয়তো আর গর্জে উঠবে না, তবে তাঁর প্রতিধ্বনি অনন্তকাল ধরে ঝঙ্কৃত হবে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।
